গোলকধাঁধা জীবন
আজ আমি এক দম্পতির গল্প বলবো। একদিন আমি তাদের মতো জীবনকে যাপন করার স্বপ্ন দেখতাম। একক পরিবার, স্বামী-স্ত্রী দুইজনই চাকরি করেন। ফেসবুকে তাদের হাস্যজ্বল ছবি দেখে আমি প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হই। আমিও তাদের মতো সুখী জীবন-যাপনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। কিন্তু হঠাৎ আমার স্বপ্ন ভেঙে যায়।
আমার স্বপ্নের দম্পতির ফেসবুকের ছবির জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তাদের দুজনেরই পৃথক এবং ব্যক্তিগত জীবন আছে, একজন অন্যজনের জীবনে প্রবেশ করতে পারে না। যেমন ধরুন, একজন অন্যজনের মোবাইল স্পর্শ করতে পারবে না, যার টাকা সে ইচ্ছামতো খরচ করবে অন্যজন বলতে পারবে না, যার বাড়ি থেকে আত্মীয় আসবে সে দেখাশোনা করবে অন্যজনের দায় নেই।
আমার স্বপ্নের ওই দম্পতির একটি মাত্র ছেলে সন্তান। লালনপালন করে কাজের বুয়া। বাসাতে বেশ কয়েকটা হোম-টিউটর রাখা আছে। পড়াশোনার বাইরে একমাত্র সঙ্গী ল্যাপটপ। সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় ক্লান্ত বাবা-মা টিভি সেটের সামনে বসে দম নেয়। বাবা-মা’র সাথে ছেলের প্রয়োজনীয় কথার বাইরে কোনো কথা হয় না।
আমার ওই স্বপ্নের দম্পতি কতদিন যে তাদের নিজেদের পছন্দমতো খাবার খায়নি সেটা একদিন জানতে পারলাম। শাকসবজি, মাছ-মাংস কিনে এনে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখে। বুয়ার যেদিন যেটা ইচ্ছা হয় রান্না করে ফ্রিজে রেখে দেয়। খাবারের একঘেয়েমি দূর করতে মাঝেমধ্যে আমার স্বপ্নের দম্পতি যে যার মতো বাইরে থেকে খেয়ে আসে।
আমার স্বপ্নের দম্পতির যে একটামাত্র ছেলে, সেটা নিয়েও ভাগাভাগি। ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দেয়া, স্কুল থেকে আনা, টিউশন ফী এসব নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকেই যায়। ছেলে কি আমার একার, তোমার না? ছেলেটি স্কুলে গিয়ে যখন দেখে তার বন্ধুরা নানান পদের টিফিন নিয়ে আসে তখন মায়ের প্রতি তার বিতৃষ্ণা জন্মায়। যখন তার বন্ধুর কাছে বন্ধুর বাবার গল্প শোনে তখন নিজের বাবার প্রতি ঘৃণা জন্মায়।
আমার স্বপ্নের দম্পতির প্রতি আমার যে দীর্ঘদিনের সম্মান তা নিমিষেই টুটে গেলো। আমার মনে হতে লাগলো যারা নিজের সংসারে সময় দিতে পারে না তাদের সংসার করা উচিত না। সেই পুরুষের সংসার করা উচিত যার স্ত্রী-সন্তানদের সময় দেয়ার মতো যথেষ্ট সময় ও ইচ্ছা আছে, সেই নারীর সংসার করা উচিত যার সন্তান লালনপালনে আকাঙ্ক্ষা আছে।
আমার স্বপ্নের দম্পতিকে দেখে আমি নিজেই স্ববিরোধী হয়ে গেলাম। তাহলে কি নারীরা চাকরি করবে না, শুধুই সন্তান লালনপালন করবে? এটা তো হতে পারে না। হ্যাঁ, নারীরা চাকরি করবে, শুধু সেই নারীরাই চাকরি করবে যারা পরিশ্রমী, চাকরির পাশাপাশি নিজের সন্তান নিজেই লালনপালন করতে পারবে অথবা এমন চাকরি করবে যে চাকরি করার পর সন্তান লালনপালনে যথেষ্ট সময় পাবে। কাজের লোকের কাছে সন্তান লালনপালন করলে সন্তানের মন-মানসিকতা কাজের লোকের মতোই হবে।
আমি একদিন আমার স্বপ্নের দম্পতির জীবন-যাপন নিয়ে ঈর্ষা করতাম। এখন আমি নিজেই সেই জীবন থেকে রক্ষা পেতে সমাধান বের করার চেষ্টা করছি। আচ্ছা, এমন হলে কেমন হয় স্ত্রী চাকরি করবে স্বামী ঘরে বসে সন্তান লালনপালন করবে! খারাপ হয় না, তবে আমি-আপনি-সমাজ তা মেনে নিতে পারবো না। কেনো পারবো না? যে যায় বলুক, আমাদের সমাজের প্রতিটি নারী-পুরুষ পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী অথবা জিনগতভাবে পুরুষতান্ত্রিক। কয়েক মিনিট ভিন্ন চিন্তা করলেও দিনশেষে ‘জায়গার পানি জায়গায় চলে যায়’।
আমরা একটু ভিন্নভাবে কি ভাবতে পারি, চিন্তা ভিন্ন হলে দোষ কী? একটা পুরুষ যদি একটা বেকার-কমশিক্ষিত-অল্পবয়সের নারীকে বিয়ে করে সংসার করতে পারে, একটা নারী কেনো বেকার-কমশিক্ষিত-অল্পবয়সের পুরুষকে বিয়ে করে সংসার করতে পারে না? মেয়েটি নিজেই কি তা মেনে নিতে পারবে? মেয়ের পরিবার মেনে নেবে? সমাজের ছি-ছি করার ভয়ে তারা কি নিজেরাই জড়সড় হয়ে যাবে না?
আমার স্বপ্নের দম্পতির গল্প আর দীর্ঘ করবো না। গল্প শুনতে এসে নিশ্চয় আপনার ক্লান্তি এসে যাবে। দীর্ঘ ছুটিতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই এখন বাড়ি থাকেন, তাদের একমাত্র ছেলেটি বাবা-মাকে বাড়িতে দেখে বিরক্তি অনুভব করে। তার মনে হয় বাবা-মা শূন্য বাড়িটিই সুন্দর, বসবাসযোগ্য। একদিন এই সন্তান যদি তার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে আমি অবাক হবো না, আপনি অবাক হবেন কি?
© আলমগীর কাইজার
০৩.০৪.২০২০

No comments