গল্প - বন্দি পাখির কাছে আকাশের ঠিকানা জানতে নেই

শহরের বহুতল কাচঘেরা করপোরেট ভবনের ষোলো তলায় তখন কৃত্রিম আলো আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাসের রাজত্ব। বাইরে ঢাকার আকাশে মেঘ জমছে। ল্যাপটপের স্কিনে জ্বলজ্বল করছে একটি বহুজাতিক টেক্সটাইল ব্র্যান্ডের নতুন বিপণন পরিকল্পনা।সেখানে উপস্থিত তিনজন মানুষ—রুদ্র, অনিন্দ্য এবং রিশা। 

তিনজনই তরুণ, নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসম্ভব মেধাবী। কিন্তু আজকের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি তাদের জীবন ও দর্শনের এক বড়ো পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে।

রুদ্র একজন স্বাধীন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সে একটি ওপেন-সোর্স লজিস্টিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা স্থানীয় তাঁতি এবং ক্ষুদ্র বস্ত্র উৎপাদনকারীদের সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে যুক্ত করতে পারে। অনিন্দ্য রুদ্রের বাল্যবন্ধু, যে বর্তমানে একটি বিশাল ইনভেস্টমেন্ট ফার্মের কান্ট্রি হেড। আর রিশা একজন সমাজবিজ্ঞানী ও টেকসই উন্নয়নকর্মী, যে মাঠপর্যায়ে রুদ্রের এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে।

বৈঠকটি ডেকেছিল অনিন্দ্য। তার উদ্দেশ্য ছিল রুদ্রের এই স্বাধীন প্ল্যাটফর্মটিকে একটি বড় করপোরেট চুক্তির আওতায় নিয়ে আসা।অনিন্দ্য ল্যাপটপের স্ক্রিন ঘুরিয়ে রুদ্রকে দেখাল, "রুদ্র, তুই যদি এই চুক্তিতে সই করিস, তবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য তোর আর তোর টিমের ফিন্যান্সিয়াল সিকিউরিটি নিয়ে ভাবতে হবে না। ওরা তোকে এককালীন বড়ো ফান্ড দেবে।

"রুদ্র মনোযোগ দিয়ে খসড়া চুক্তিপত্রটি পড়ছিল। পড়তে পড়তে তার কপাল কুঁচকে গেল। সে শান্ত গলায় বলল, "অনিন্দ্য, চুক্তির চার নম্বর ধারাটা খেয়াল করেছিস? ওরা বলছে, এই প্ল্যাটফর্মের সোর্স কোড সম্পূর্ণ তাদের মালিকানায় চলে যাবে। স্থানীয় তাঁতিরা কোন্‌ দামে পণ্য বিক্রি করবেন, সেটা এই বহুজাতিক কোম্পানি নির্ধারণ করবে। শুধু তাই নয়, আমাদের নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। আমরা কেবল তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়ে যাব।"

অনিন্দ্য মৃদু হাসল। সেই হাসিতে একধরণের ক্লান্তি আর আত্মসমর্পণ লুকিয়ে ছিল। সে বলল, "রুদ্র, তুই এখনো আদর্শের দুনিয়ায় বাস করিস। বাস্তবতায় আয়। বড়ো সিস্টেমের ভেতরে ঢুকে কাজ করতে হলে কিছুটা স্বাধীনতা ছাড়তেই হয়। আমিও তো এই বড়ো সিস্টেমের অংশ। আমার কি নিজের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আছে? নেই। কিন্তু মাস শেষে আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আর এই ক্ষমতাটাই আসল।

"রিশা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। সে অনিন্দ্যর দিকে তাকিয়ে বলল, "অনিন্দ্য, তুমি যেটাকে ‘সিস্টেমের অংশ হওয়া’ বলছ, সেটা আসলে একধরণের আধুনিক দাসত্ব। তুমি নিজের মেধা, সময় আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একটা অদৃশ্য শক্তির কাছে বন্ধক রেখেছ। তুমি এখন নিজের ইচ্ছায় নয়, ওদের ইশারায় চলো।"

অনিন্দ্য কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল, "রিশা, প্রগতিশীলতা মানে শুধু বড়ো বড়ো কথা বলা নয়। প্রগতিশীলতা মানে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা। রুদ্র, তুই যদি এই সুযোগ হাতছাড়া করিস, তবে এই শহরে টিকে থাকা কঠিন হবে। আমি তোর ভালো চাই বলেই বলছি, ওদের শর্ত মেনে নে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, দাসত্ব শব্দটা খুব কড়া, একে করপোরেট ডিসিপ্লিন বলা ভালো।"

রুদ্র চেয়ার ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ঢাকার রাস্তায় জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির সারি। সে ভাবছিল, অনিন্দ্য একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে তুখড় ছাত্রনেতা ছিল। যে অনিন্দ্য মেহনতি মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলত, আজ সে নিজেই এক বিশাল করপোরেট চাকার ছোটো একটি নাট-বল্টু। সে নিজের স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং এখন সে অন্যকেও সেই একই খাঁচায় বন্দি হতে প্ররোচিত করছে।

রুদ্র ঘুরে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্যর চোখে চোখ রাখল। তার কণ্ঠস্বর ছিল দৃঢ় এবং কঠিন। "অনিন্দ্য, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কখন হয় জানিস? যখন সে এমন কোনো ব্যক্তির পরামর্শ বা আদেশ মেনে চলে, যে নিজে ইতিমধ্যে দাসত্ব গ্রহণ করেছে। তুই নিজের মেরুদণ্ডটা বিকিয়ে দিয়েছিস একটা আরামদায়ক জীবনের জন্য। তুই এখন স্বাধীনভাবে ভাবতেই ভুলে গেছিস। তোর কাছে মনে হচ্ছে এই খাঁচাটাই নিরাপদ।"

অনিন্দ্য কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রুদ্র তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো– "আমরা যে প্রগতির কথা বলি, তা কেবল আধুনিক প্রযুক্তি বা দামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরা নয়। প্রগতিশীলতা হলো নিজের চিন্তার স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং শোষণের বিরুদ্ধে বিকল্প তৈরি করা। তুই যার দাসত্ব করছিস, সে কখনো তোকে মুক্তভাবে ডানা মেলতে দেবে না। আর তুই চাচ্ছিস আমিও তোর মতো সেই শিকল পায়ে পরি?"

রিশা রুদ্রের পাশে এসে দাঁড়াল। সে অনিন্দ্যকে উদ্দেশ্য করে বলল, "অনিন্দ্য, আমরা রুদ্রের তৈরি করা এই ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম নিয়েই এগোবো। আমাদের লাভ হয়তো কম হবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমাদের নিজেদের এবং এদেশের প্রান্তিক মানুষের হাতে। আমরা কোনো করপোরেট প্রভুর দাস হবো না।"

রুদ্র টেবিল থেকে তার ফাইলগুলো গুছিয়ে নিল। অনিন্দ্যর দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল, "ধন্যবাদ অনিন্দ্য, তোর এই প্রস্তাবটার জন্য। এটা আজ আমাকে একটা বড়ো সত্য মনে করিয়ে দিল— কখনো কোনো বন্দি পাখির কাছ থেকে আকাশের ঠিকানা জানতে নেই। কারণ সে খাঁচাটাকেই তার আকাশ মনে করে।"

রুদ্র এবং রিশা কনফারেন্স রুম থেকে বের হয়ে এলো। লিফট ছেড়ে তারা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল। তাদের পায়ে কোনো শিকল ছিল না, চোখে ছিল এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন— যেখানে তরুণরা নিজের শর্তে, নিজের স্বাধীনতায় মাথা উঁচু করে বাঁচবে। পেছনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেই বিলাসবহুল ঘরে অনিন্দ্য একা বসে রইল। তার সামনে পড়ে রইল কোটি টাকার সেই চুক্তিপত্র, যা তার পদমর্যাদা বাড়াতে পারত, কিন্তু ভেতরের মানুষটাকে আর কখনো মুক্ত করতে পারত না।

বন্দি পাখির কাছে আকাশের ঠিকানা জানতে নেই
© আলমগীর কাইজার
১৭.০৭.২০২৬

No comments

Powered by Blogger.